উইকিপিডিয়া: বিনামূল্য তথ্যের অসীম আধার

উইকিপিডিয়া: বিনামূল্য তথ্যের অসীম আধার

ফেলুদার যখনই কোনো বিষয়ে বিশদে জানবার প্রয়োজন হতো, সে গিয়ে হাজির হতো সিধু জ্যাঠার বাড়িতে। সিধু জ্যাঠার কাছে যেকোনো বিষয়ে যাবতীয় সকল জ্ঞানের হদিস মিলতো। আফসোস, আমাদের কোনো সিধু জ্যাঠা নেই। তবে তাই বলে আমরা যে একদম জলে পড়ে আছি, তা-ও কিন্তু নয়। আমাদের রয়েছে প্রায় সিধু জ্যাঠার মতোই নির্ভরযোগ্য একটি এনসাইক্লোপিডিয়া, যার কাছে আমরা এমনকি রাত দুটোর সময়েও সাহায্যের আবদার জানাতে পারি।

যার কথা বলছি, সে হলো উইকিপিডিয়া। আমরা সবাই যে জেনে-বুঝে উইকিপিডিয়ার কাছে সাহায্য চাই তা অবশ্য নয়। যেহেতু এখন আমাদের সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, আর তাতে আছে ইন্টারনেট ব্রাউজার, তাই প্রয়োজন পড়লেই আমরা গুগলে গিয়ে যেকোনো বিষয়ে সার্চ দিই। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাপ্ত রেজাল্টের প্রথম পাঁচটির মধ্যে একটি হয় উইকিপিডিয়ার।

উইকিপিডিয়ার লোগো; Image Source: Wikipedia

উইকিপিডিয়া কী?

উইকিপিডিয়ার নামকরণ হয়েছে উইকি ও এনসাইক্লোপিডিয়া এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে। এনসাইক্লোপিডিয়া তথা বিশ্বকোষের অর্থ সকলেরই জানা। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, উইকি অর্থ কী? উইকি মানে হলো, যে ওয়েবসাইট বা ডেটাবেস সম্মিলিতভাবে অনেক মানুষ বা ব্যবহারকারীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, এবং যেখানকার কনটেন্ট যেকোনো ব্যবহারকারীই এডিট করার ক্ষমতা রাখে, কিংবা নিজেরাই নতুন কোনো কনটেন্ট যুক্ত করতে পারে।

এই মুহূর্তে উইকিপিডিয়া ইন্টারনেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রেফারেন্স সাইট। সামগ্রিকভাবে অ্যালেক্সা র‍্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের প্রথম পাঁচটি ওয়েবসাইটের অন্যতম এটি। অলাভজনক সংগঠন উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের মালিকানা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এই ওয়েবসাইট। উইকিমিডিয়ার অন্যান্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মতো উইকিপিডিয়াও চলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রদত্ত অনুদানের অর্থে।

উইকিপিডিয়ার ইতিহাস

উইকিপিডিয়াই অনলাইনে সম্মিলিত শক্তিতে এনসাইক্লোপিডিয়া গড়ে তোলার প্রথম প্রয়াস নয়। তবে প্রথম সার্থক প্রয়াস বলা চলে একেই। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত নিউপিডিয়া (Nupedia) নামক অন্য একটি বিনামূল্যের ইংরেজি ভাষার এনসাইক্লোপিডিয়ার অংশ হিসেবে। নিউপিডিয়ায় প্রতিটি আর্টিকেল লিখতেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। আর্টিকেলগুলো হতো বিস্তৃত গবেষণার ফসল, এবং প্রকাশিত হবার আগে সেগুলোকে কয়েক ধাপে নিয়মতান্ত্রিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হতো।

জিমি ওয়েলস ও ল্যারি স্যাঙ্গার; Image Source: The Sun

নিউপিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০০ সালের ৯ মার্চ। এর মালিকানা ছিল বোমিস নামক একটি ওয়েব পোর্টাল কোম্পানির হাতে। সিইও হিসেবে ছিলেন জিমি ওয়েলস, আর এডিটর ইন চিফ ল্যারি স্যাঙ্গার। এছাড়াও একাডেমিকভাবে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করা এবং নিজ নিজ অঙ্গনে বিশেষজ্ঞ এমন বহু মানুষ কাজ করতেন এখানে। প্রধান দুটি নীতি অনুসরণ করে নিউপিডিয়ায় আর্টিকেল প্রকাশিত হতো।

  • প্রতিটি আর্টিকেলই হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। যদি কোনো ঘটনা বিতর্কিত হয়ে থাকে এবং সেখানে একাধিক পক্ষের সন্ধান মেলে, তাহলে প্রকাশিত আর্টিকেলে প্রতিটি পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকেই ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করা হবে।
  • কোনো আর্টিকেলই কেবল একজন লেখক দ্বারা রচিত হবে না। প্রতিটি আর্টিকেলই সম্মিলিতভাবে, বেশ কয়েকজন লেখক মিলে লিখবেন। কিন্তু এজন্য একজন লেখকও কোনো কৃতিত্ব পাবেন না।

এই সব নিয়ম মেনে, নির্ধারিত ব্যবস্থার সকল ধাপ পার হয়ে ২০০০ সালের জুলাইয়ে নিউপিডিয়ায় প্রথম আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। কিন্তু এখানকার কর্মপদ্ধতি অনেক জটিল হওয়ায় কাজ এগোতে থাকে একদমই ঢিমেতালে। ২০০১ সালের শেষ নাগাদ মাত্র ২৫টি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়, এবং আরও প্রায় ১৫০টি আর্টিকেল পর্যালোচনার প্রক্রিয়াধীন থাকে।

নিউপিডিয়া যখন নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, এরই সমান্তরালে অনুরূপ আরও একটি এনসাইক্লোপিডিয়া চালু করার কথা মাথায় আসে ওয়েলস ও স্যাঙ্গারের, যেটির বহিরাবরণ হবে নিউপিডিয়ার মতোই। কিন্তু আর্টিকেল প্রকাশের ক্ষেত্রে যেখানে এত নিয়মকানুনের বালাই থাকবে না, বরং যে কেউই সেখানে আর্টিকেল লিখতে ও প্রয়োজনমাফিক এডিট করতে পারবে। আর সেজন্য এই এনসাইক্লোপিডিয়ার নামে উইকি কথাটি থাকবে, এটি ছিল স্যাঙ্গারের মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা।

এই চিন্তা মাথায় রেখেই ২০০১ সালের ১২ ও ১৩ জানুয়ারি যথাক্রমে Wikipedia.com ও wikipedia.org এই দুটি ডোমেইনের নিবন্ধন করা হয়, এবং ১৫ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে উইকিপিডিয়া। কার্যত এটি নিউপিডিয়ার অংশ হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে থাকে। শুরুর মাসগুলোতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ছাড়া নিউপিডিয়ার আর কোনো নীতিই এখানে তেমন জোর দিয়ে অনুসরণ করা হচ্ছিল না।

উইকিপিডিয়ায় কোনো জটিল নিয়মকানুন না থাকায়, এবং এখানে যে কেউ লিখতে পারায়, একদম শুরু থেকেই প্রচন্ড জনপ্রিয়তা লাভ করে এটি। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাস শেষ হতে না হতেই প্রকাশিত আর্টিকেলের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যায়, এবং মাত্র তিন মাস পর, মে মাসে উইকিপিডিয়ায় আর্টিকেলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,৯০০-তে।

কর্মব্যস্ত উইকি কর্মীরা; Image Source: Wikimedia

জন্মগতভাবেই জ্ঞানের প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণ রয়েছে এটি সর্বজনবিদিত সত্য। কিন্তু উইকিপিডিয়া যাত্রা শুরু করার পর নতুন করে এই সত্যও উদ্ঘাটিত হয় যে, জ্ঞানের সৃষ্টি, বিকাশ ও বিস্তারেও কিছু মানুষের সমান আগ্রহ থাকে। সেজন্যই কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই, কোনো ব্যক্তিস্বার্থের উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও, এমনকি ন্যূনতম কৃতিত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকার পরও, একঝাঁক উদ্যমী কর্মী স্রেফ নিজেদের ভালোলাগা থেকে প্রতিনিয়ত উইকিপিডিয়ার জন্য নতুন নতুন আর্টিকেল রচনা করে যেতে থাকে, আর পূর্ব-প্রকাশিত আর্টিকেলগুলোকেও নিয়মিত এডিটের মাধ্যমে হালনাগাদ অবস্থায় রাখতে থাকে।

উইকিপিডিয়ার এমন অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তায় একটি বিশেষ ভূমিকা রাখে গুগল। এমন নয় যে উইকিপিডিয়ার জন্য তারা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। গুগলের ধরনই এমন যে, কোনো কি-ওয়ার্ড লিখে সার্চ দিলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আর্টিকেলগুলো সে সবার আগে প্রদর্শন করবে। উইকিপিডিয়ার আর্টিকেলগুলো সেই চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হওয়ায়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কি-ওয়ার্ড লিখে সার্চ দিলেই তারা প্রথমে উইকিপিডিয়ার আর্টিকেল দেখাতে থাকে। এর ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ উইকিপিডিয়ার হদিস পেতে থাকে, নিজেরাও এর সাথে যুক্ত হতে থাকে পাঠক ও লেখক হিসেবে। আর এভাবেই একাধারে যেমন উইকিপিডিয়ার ট্রাফিক বাড়তে থাকে, তেমনই সমানতালে বাড়তে থাকে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং কনটেন্টের পরিমাণ।

উইকিপিডিয়ার এগিয়ে চলা

জনপ্রিয়তা ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে উন্মেষ ঘটতে থাকে উইকিপিডিয়ার নতুন নতুন ভাষা সংস্করণের। ২০০৪ সালের শেষেই ১৬১টি ভাষায় চালু হয়ে যায় উইকিপিডিয়া। এদিকে উইকিপিডিয়া যেমন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশই উপরে উঠে যাচ্ছিল, ঠিক ততটাই অবনমন ঘটছিল নিউপিডিয়ার। তারপরও ২০০৩ সাল পর্যন্ত উইকিপিডিয়া ও নিউপিডিয়া হাত ধরাধরি করেই এগোতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউপিডিয়ার সার্ভার যখন চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন নিউপিডিয়ায় প্রকাশিত আর্টিকেলগুলোও যুক্ত হয়ে যায় উইকিপিডিয়ায়।

২০০৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বিশ লক্ষ আর্টিকেলের মাইলফলক স্পর্শ করে ইংরেজি ভাষার উইকিপিডিয়া। আর এর মাধ্যমে ১৪০৮ সালে প্রকাশিত ইয়োঙ্গোল এনসাইক্লোপিডিয়ার প্রায় ৬০০ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে উইকিপিডিয়া পরিণত হয় সর্বকালের বৃহত্তম এনসাইক্লোপিডিয়ায়।

উইকিপিডিয়ার হোমপেজে ভাষা সূচি, Picture Courtesy: Wikipedia

২০০৯ সালের আগস্টে ইংরেজি উইকিপিডিয়া ত্রিশ লক্ষ আর্টিকেলের মাইলফলক স্পর্শ করে। এই মুহূর্তে (২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় আর্টিকেলের সংখ্যা প্রায় ৫৮ লক্ষের কাছাকাছি। সবমিলিয়ে এই মুহূর্তে ৩০১টি ভাষায় উইকিপিডিয়া চালু রয়েছে। সব ভাষার আর্টিকেল মিলিয়ে উইকিপিডিয়ার বর্তমান আর্টিকেলের সংখ্যা চার কোটিরও বেশি।

উইকিপিডিয়ার বাংলা সংস্করণ যাত্রা শুরু করে ২০০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি।  ৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত বাংলা উইকিপিডিয়াতে ৬২,৮৭৫টি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। 

ইন্টারনেট দুনিয়ায় উইকিপিডিয়ার অবিশ্বাস্য সাফল্য

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে উইকিপিডিয়া প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সেরা দশ জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের তালিকায় প্রবেশ করে। সেই সময়ে মাসিক ৪২.৯ মিলিয়ন ইউনিক ভিজিটর নিয়ে ৯ নম্বরে অবস্থান করা উইকিপিডিয়া এগিয়ে ছিল এমনকি নিউ ইয়র্ক টাইমস (১০) ও অ্যাপলের থেকেও। অবশ্য উইকিপিডিয়ার বর্তমান সাফল্যের কাছে এই সব সংখ্যাকেই ফিকে মনে হবে। এই মুহূর্তে উইকিপিডিয়া বিশ্বের পঞ্চম জনপ্রিয়তম ওয়েবসাইট। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, উইকিপিডিয়ার বর্তমান পেজ ভিউ মাসে ১৮ বিলিয়ন, আর ইউনিক ভিজিটরের সংখ্যা ৫০০ মিলিয়ন। এই মুহূর্তে অ্যালেক্সা র‍্যাংকিংয়ে উইকিপিডিয়ার চেয়ে এগিয়ে আছে কেবলই গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক ও বাইডু।

উইকিপিডিয়ার জনপ্রিয়তার কারণ

“Imagine a world in which every single person on the planet is given free access to the sum of full human knowledge. That’s what we are doing.” – Jimmy Wales

উইকিপিডিয়ার সিইওর কথা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় এই ওয়েবসাইটের এমন বিপুল সাফল্যের নেপথ্যের কারণ। ২০০১ সালে যখন উইকিপিডিয়া যাত্রা শুরু করেছিল, তখন হয়তো উইকিপিডিয়ার যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এখন ভার্চুয়াল জগতে হাজার হাজার রেফারেন্সিং সাইট। তারপরও উইকিপিডিয়ার একক আধিপত্যে আজও ভাগ বসাতে পারেনি অন্য কেউ। এর প্রধান কারণ উইকিপিডিয়ার সাধাসিধে ব্যবহারবিধি, আর আর্টিকেলগুলোর সহজবোধ্যতা।

উইকিপিডিয়ার আর্টিকেলগুলো এমনভাবে লেখা হয়ে থাকে যে একবার সেগুলো পড়ে নিলেই কোনো বিষয়ে পাঠক যাবতীয় জ্ঞান লাভ করতে পারুক কিংবা না পারুক, নির্দিষ্ট বিষয়ে মোটামুটি কাজ চালাবার মতো পরিষ্কার ধারণা সে পাবেই। আর বর্তমান সময়ে পাঠকদের প্রধান চাহিদা তো এটিই। অন্য অনেক ওয়েবসাইট আছে যেখানে হয়তো কোনো বিষয়ের আরও গভীর বিশ্লেষণ ও অজানা তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু উইকিপিডিয়ার মতো সহজবোধ্যতা সেগুলোর নেই।

তাছাড়া উইকিপিডিয়াই হলো একমাত্র গন্তব্য যেখানে একসাথে সকল বিষয়ের তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হয়তো নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক ভালো ভালো আর্টিকেল পাওয়া যায়, কিন্তু উইকিপিডিয়ার মতো একই জায়গায় ধর্ম আবার খেলাধুলা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, যাবতীয় সব তথ্য পাওয়া যাবে এমন ওয়েবসাইট এখনও দ্বিতীয়টি তৈরি হয়নি।

হালনাগাদ তথ্য সবার আগে পাওয়া যাওয়াটাও একটি ইতিবাচক দিক। সদ্যই ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনার উপরই দ্রুততম সময়ে উইকিপিডিয়ায় নতুন পেজ তৈরি হয়ে যায়, আর উইকিপিডিয়ার এডিটররা প্রতি মুহূর্তে সেখানে নতুন নতুন তথ্য যোগ করতে থাকেন। সাধারণ নিউজ পোর্টালগুলোতেও কেবল একটি সংবাদ পড়েই নির্দিষ্ট বিষয়ে সবকিছু জেনে ফেলা সম্ভব না, যে সুযোগ রয়েছে কেবল উইকিপিডিয়ায়। যেমন ধরুন, বিশ্বের কোনো জায়গায় সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এখন আপনি যদি মূলধারার কোনো গণমাধ্যম থেকে সে বিষয়ে জানতে চান, তাহলে পুরো ঘটনাটি অনুধাবন করতে হলে আপনাকে কম করে হলেও তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সংবাদ তো পড়তে হবেই। কিন্তু উইকিপিডিয়া হলো সেই মাধ্যম, যেখানে একসাথে ওই তিনটি সূত্র থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য অল্প অল্প করে নিয়ে, স্বল্প সময়ের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ আঙ্গিকে গোটা ঘটনাটিকে উপস্থাপন করা হবে।

উইকিপিডিয়া নিয়ে তৈরি মিম; Image Source: Wikipedia

২০০৫ সালে ন্যাচার পত্রিকা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ও উইকিপিডিয়ার ৪২টি আর্টিকেল পাশাপাশি রেখে, তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখায় যে উইকিপিডিয়ার যথার্থতার সাথে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। আবার টাইম ম্যাগাজিনের মতে, উইকিপিডিয়ায় যে কেউ, কোনো রকম নিবন্ধন ছাড়াই আর্টিকেল যোগ করা বা এডিট করার ক্ষমতা রাখে বিধায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়, এবং সম্ভবত সেরা এনসাইক্লোপিডিয়ায় পরিণত হয়েছে।

রয়েছে সমালোচনাও

উইকিডিয়ার নামে বেশ কিছু অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো, উইকিপিডিয়ায় পদ্ধতিগত পক্ষপাত (Systemic bias) দেখা যায়, এবং এখানে সত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যাকে মিশ্রণের মাধ্যমে এমনভাবে পরিবেশন করা হয় যে পাঠক সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করতে না পেরে বিভ্রান্তির শিকার হয়। এই অভিযোগটিকে উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষ নিজেরাও কখনোই একেবারে উড়িয়ে দিতে পারবে না। কেননা এই ওয়েবসাইটের ধরনই এমন যে, এখানে যে কেউ যথেচ্ছ লিখতে বা পরিবর্তন করার এখতিয়ার রাখে। ফলে একই ঘটনা একাধিক ব্যক্তি একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করায় এবং তাদের আলাদা আলাদা এজেন্ডা থাকায়, অনেকক্ষেত্রেই প্রকাশিত আর্টিকেলগুলো নিরপেক্ষতা হারায়।

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এমন সম্ভাবনা কম থাকে; যেহেতু সেসব পেজে এডিটরদের নিয়মিত আনাগোনা থাকে, ফলে কেউ বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য উপস্থাপন করলে অন্যরা তাড়াতাড়ি সেটি লক্ষ্য করে ভুলটি সংশোধন করে দিতে পারে। কিন্তু স্থানীয় কোনো ইস্যু, যেখানে কাজ করা এডিটরের সংখ্যা তেমন বেশি থাকে না, সেখানে চাইলেই কোনো একজন এডিটর নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করতে কোনো একটি ভুল তথ্য যোগ করে দিতে পারে। সেই ভুলটি অন্য কোনো এডিটরের চোখে পড়ার আগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক ভুল তথ্যটি থেকে বিভ্রান্তির শিকার হতে পারে।

উইকিপিডিয়ার আরেকটি দুর্বলতা হলো, আর্টিকেলগুলো কোনো বিশেষজ্ঞ দ্বারা রচিত হয় না বলে একাডেমিক ফিল্ডে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা একদমই কমে গেছে। যে কেউ চাইলেই ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য যোগ করতে পারে বলে আজকাল উইকিপিডিয়াকে রেফারেন্স হিসেবে স্বীকার করতে চান না অনেকেই। তাই জনপ্রিয়তা ও ট্রাফিকের দিক থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও, গ্রহণযোগ্যতার বিচারে উইকিপিডিয়া স্বীকৃত জার্নালগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে।

উইকিপিডিয়ার বিষয়ভিত্তিক আর্টিকেলের অনুপাত; Image Source: Wikipedia

শেষ কথা

ভালো খারাপ মিলিয়েই সবকিছু। উইকিপিডিয়াও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়, এবং সেগুলো নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন উইকিপিডিয়া সংশ্লিষ্ট সকলেই। তারপরও উইকিপিডিয়া যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সত্যিই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি না মেনে উপায় নেই। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের বিষয়টি পরে আসে। শুরুতে কিন্তু যেকোনো ব্যাপারে খতিয়ে দেখতে আমরা উইকিপিডিয়ারই দ্বারস্থ হই।

উইকিপিডিয়া পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি বিশাল বড় সাফল্যের প্রতীকও বটে। টাকা ছাড়া আজকাল যেখানে কোনো কিছুই সম্ভব না, সেখানে এই ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েও কোনো বিজ্ঞাপন থেকে আয় না করে, স্রেফ ব্যবহারকারীদের অনুদান আর ট্রাফিক থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর ভর করেই টিকে আছে এই ওয়েবসাইট।

আর সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো উইকিপিডিয়ার এডিটররা। কোনো প্রতিদানের আশা না করেই তারা প্রতি মুহূর্তে নিজেদের কর্মক্ষমতার সর্বোচ্চ ঢেলে দিয়ে যেভাবে জনগণের তথ্যলাভের অধিকার নিশ্চিত করছে, তার প্রশংসা না করলেই নয়। ইদানীং হয়তো উইকিপিডিয়ার স্বেচ্চাসেবী এডিটরদের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে, তারপরও আমরা ধরে নিতেই পারি, যতদিন এডিটরদের সংখ্যা একেবারে শূন্যে নেমে না আসবে, ততদিন উইকিপিডিয়ার পথচলা অব্যহত থাকবে

-সোর্স : রোর মিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *